অস্তরাগে স্মৃতি সমুজ্জ্বল প্রিয় বিদ্যাপীঠ

164
আলমডাঙ্গা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়
আলমডাঙ্গা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়

স্কুলটাকে ঘিরে আমার মতই অজস্র স্মৃতি জমে আছে স্কুলটির সহস্র ছাত্র-ছাত্রীর মনে। তাদের সবাইকে, এবং বেশির ভাগকেই, আমি চিনি না; তাদের কাছে আমিও অচেনা। তবে এইটুকু নিশ্চিত, স্কুলটির সামনে দিয়ে গেলে তারাও আমার মতই নস্টালজিক হয়ে পড়েন, হয়ত সঙ্গোপনে দীর্ঘশ্বাস চেপে মনে মনে বলেন , ‘আহারে, আবার যদি ফিরতে পারতাম শৈশব কৈশোরের দিনগুলোতে!’ আমাদের চেনা-জানার জায়গাটা কিন্তু এখানেই।

স্মৃতিকথা এবং শুরুর গল্প

আলমাডাঙ্গার প্রধান সড়কের কোল ঘেঁষে অবস্থান। পথে বের হলেই স্কুলটার সামনে দিয়ে আসতে যেতে হয় অসংখ্যবার। মাঝে মাঝে স্কুলের প্রধান ফটকটা সময়কে কেমন যেন থামিয়ে দিয়ে সুদূর অতীত নিয়ে যায়। নিয়ে যায় সেই ১৯৮৪ সালের জুন মাসের ৪ তারিখে। ঐ দিনই যে আলমডাঙ্গা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় -এর একটি শ্রেনিকক্ষে হয়েছিল আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হাতেখড়ি। লম্বা একটা পথ চলব বলে প্রথম পদক্ষেপ ফেলেছিলাম ওখানেই। গৃহ শিক্ষিকা প্রায়ত ঝর্ণা আপার হাত ধরে ঐ দিন প্রথম ঢুকেছিলাম প্রিয় বিদ্যাপীঠের চৌহদ্দিতে।

স্কুলের চৌহদ্দিতে যখন প্রবেশ করি, তখন প্রথম ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। হেড স্যারের অফিসে ঢুকতেই তিনি ঝর্ণা আপাকে দাপ্তরিক কাজ (ফরম পুরন, টাকা জমা ইত্যাদি) সারতে বললেন এবং আমাকে পাঠিয়ে দিলেন ক্লাসে। স্কুলের আয়া (যাকে সবাই ‘নানি/ঝড়ির মা’ বলে ডাকতো) আমাকে ক্লাসে নিয়ে গেলেন। তখন ক্লাস নিচ্ছিলেন আসমা আপা । ক্লাসের দরজায় দাঁড়াতেই রাসেল রেজা (বিপুল) আমাকে ডেকে নিয়ে তার পাশে বসার জায়গা করে দিল। মুহূর্তের মধ্যেই বন্ধুত্ব। বিপুল আমার প্রথম বন্ধু।

এরপর প্রায় সাড়ে চার বছর ধরে অজস্র স্মৃতি। সবার আগে ক্লাসে ঢুকে ফার্স্ট বেঞ্চের ধারে বসে বন্ধুদের জন্য জায়গা রাখার চেষ্টা, স্কুলের মাঠে দৌড়-ঝাপ-মারামারি-গোল হয়ে বসে গল্প-আড্ডা-নাইট রাইডার-দ্যা এটিম খেলা; কোন কোন দিন প্রধান গেইট এবং দ্বিতীয় গেটের মাঝামাঝি লম্বা রাস্তাটায় বসে থাকা ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকে আর স্কুল গেইট লাগোয়া দোকানটি থেকে আইসক্রিম, চীনেবাদাম, ঝুরি ভাজা, ঝালমুড়ি, সুইটবল ইত্যাদি কিনে এক দৌড়ে থানা কম্পাউন্ডে ঢুকে সেখানকার সদ্য নির্মিত সিমেন্টের বেঞ্চগুলোতে বসে হৈহুল্লড় করে একসাথে খাওয়া দাওয়া। চোর-ডাকাত পেটানোও দেখতাম মাঝে মাঝে।

ছাত্র সমাবেশের সময় লাইনে দাঁড়িয়ে কোরআনের আয়াত শোনা, শপথ বাক্য পাঠ এবং জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া; সাথে নুরুল ইসলাম স্যারের কমান্ডে কিছুক্ষণ পিটি-প্যারেড। সমাবেশ শেষে লাইন ধরে ক্লাসে। বড় মমতা আর যত্ন নিয়ে পড়াতেন শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ। পড়া না পারলে মৃদু বকাঝকা, বেত্রাঘাত অথবা দাঁড়িয়ে থাকা (মাঝে মাঝে কান ধরে, মাঝে মাঝে বেঞ্চের উপর) ছিল শাস্তি। তবে মমতায় ছিল বেশী। আদব-কায়দার উপর গুরুত্ব ছিল বেশী। আদবের বরখেলাপ হলে শস্তি বেশী হতো।

যেসব শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মমতায় আর ছায়ায় বেড়ে উঠেছিলাম- সৈয়দ উদ্দিন জোয়ারদার স্যার, আমজাদ স্যার, জলিল স্যার, আফসার স্যার, মৌলভি স্যার, রুনু আপা, ফিরোজা আপা, মায়া আপা, পূর্ণিমা আপা, মঞ্জু আপা, আসগারী আপা, জিকের আপা, আসমা আপা, স্নো আপা (চুয়াডাঙ্গার আপা), শেফা আপা (সবার নাম মনেও করতে পারছি না)- তাঁরা একেকটা অধ্যায় মত। কাকে রেখে কার কথা লিখি? সবাইকে নিয়ে লিখতে গেলে শব্দ এবং সময় লেগে যাবে ঢের। কোন একদিন লিখব নিশ্চয়।

টিফিন পিরিয়ডে সাধারণত বাড়িতে বাড়িতে খেতে যেতাম। যেদিন বাড়ি যেতাম তা সেদিন বন্ধুরা সবাই স্কুলের টিউবওয়েলে মুখ লাগিয়ে ভরপেট পানি খেয়েই সেরে নিতাম টিফিন, ভাগ্য ভাল হলে বন্ধু- বান্ধবীদের টিফিন বক্সের খাবার না বলে চেয়ে নিয়ে……। দুই এক টাকা যা বাড়ি থেকে দিত তা তো স্কুলে যাওয়ার পরপরই শেষ করে সবাই ফতুর। কিনে খাওয়ার উপায় নেই। প্রায় দিনই পানি আর মাঝে-মধ্যে না বলে চেয়ে-চিন্তে খাওয়া সাড়া উপায় ছিল না।

প্রাইমারী সেকশানের জানালাগুলো দিয়ে মান্নান স্যারকে চোখে পড়তো সব সময়। মূল ভবনের প্রথম কক্ষটার জানালার পাশে বসে একাগ্র মনে সামলাতেন স্কুলের হিসাব বিভাগ। কোন শিক্ষক/শিক্ষিকার অনুপস্থিতিতে ক্লাস নিতেন কদাচিৎ। শ্বেত-শুভ্র মানুষটার চেহারা এখনও চোখে ভাসে। ঘন্টা নানি আর ঝড়ি খালার স্নেহ-শাসনের কথাও মনে আছে বেশ। ঝড়ি খালা নোটিশের খাতা নিয়ে যেতেন ক্লাসে ক্লাসে। তাদের ছুটির ঘন্টা শোনার জন্য কান পেতে থাকতাম যে সবাই।

বাৎসরিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, স্কুল প্রথম-দ্বিতিয়-তৃতীয়দের মাঝে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান, বিভিন্ন জাতীয় দিনে লাইন দিয়ে উপজেলা কম্পাউন্ডে যাওয়া, ইন্টার স্কুল হ্যান্ডবল খেলা, এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায়ী অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে স্কুলের উৎসব মুখর দিনগুলোর কথাগুলো ভুলি কীভাবে?

গত শতকের ষাটের দশক। আলমডাঙ্গায় তখন চমৎকার একটি মধ্যবিত্ত সমাজ গড়ে উঠছিল। তখনকার কিছু মার্জিত রুচিশীল শিক্ষিত উদারমনা সৎ মানুষ মিলে গড়ে তুলছিলেন সেই সমাজ। তাদের পরিবারের কিছু মেয়ে যখন ‘মেরিট লেভেল ফোর’ পাশ করেন, তখন আলমডাঙ্গায় একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপনের প্রয়োজন দেখা দেয়।

এগিয়ে আসেন মরহুম খবিরুদ্দিন আহমেদ, মরহুম নাজমুল কাওনাইন (জমজম মিয়া), মরহুম আব্দুল মোকিম চৌধুরী, শহীদ ডঃ বজলুল হক, আলমডাঙ্গা পাইলট হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মরহুম আব্দুল জব্বার মিয়া, শ্রদ্ধেয় হবিব দারোগা, প্রায়ত প্রহ্লাদ রায় পাডিয়া, মরহুম আজাহারুল ইসলাম সহ আরো অনেকেই। একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় গিয়ে গভর্নরের সাথে দেখা করে। সেখনে মরহুম খবিরুদ্দিন সাহেব বালিকা বিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। পরে ডঃ বিপিন চন্দ্র পালের বসত-ভিটায় ১৯৬১ সালে যাত্রা শুরু হয় স্কুলটির।

ডঃ বিপিন চন্দ্র পাল চোখের চিকিৎসক ছিলেন। দেশ ভাগের পর তিনি ভারতে চলে গেলে আলমডাঙ্গা থানার সামনে অবস্থিত তার দোতলা বাড়ি সহ সংলগ্ন জমি পরিত্যাক্ত হয়ে যায়। সেই দোতলা ভবনটিতেই ১০-১২ জন ছাত্রী নিয়ে শুরু হয় আলমডাঙ্গা পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের কার্যক্রম। যারা মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এই বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছেন তারা সেই ভাঙাচোরা দালান নিশ্চয়ই দেখে থাকবেন।

প্রথম ছাত্রীদের মধ্যে যাদের নাম উদ্ধার করতে পেরেছি তারা হলেন আলমডাঙ্গা পাইলট হাইস্কুলের প্রতিযশা শিক্ষক জনাব আব্দুল জব্বার মিয়ার কন্যা শ্রদ্ধেয় নাজু, শহীদ ডঃ বজলুল হকের কন্যা বিলকিস পারভীন রানু, শ্রদ্ধেয় হবিব দারোগা সাহেবের কন্যা মায়া আপা, জনাব ডঃ আব্দুল হান্নান সাহেবের ভাইয়ের কন্যা আদিল, গোবিন্দপুর নিবাসী ডঃ শমশের আলী মিয়ার শ্যালিকা শ্রদ্ধেয় রেবা, এবং জনাব সিরাজুল হক রবু মিয়ার স্ত্রী শ্রদ্ধেয় বুলবুলি, কালিদাসপুর নিবাসী শ্রদ্ধেয় তারাচাঁদ মালিথার কন্যা নূরজাহান বেগম বেনু । এঁরাই হচ্ছেন আলমডাঙ্গার নারী শিক্ষার প্রথম পথ প্রদর্শক। প্রথম পর্যায়ে একটা শ্রেণিরই পাঠদান করা হতো, তা হলো পঞ্চম শ্রেণি।

প্রতিষ্ঠাকালিন সময়ে জনাব খবিরুদ্দিন আহমেদের অবদান সবচেয়ে বেশি। সে সময়ে তিনি সাথে নিয়েছিলেন জনাব আহমদ মল্লিক, জনাব খোস্তার মীর, জনাব জমজম মিয়া, শহীদ ডা. বজলুল হক, গিরিধারী বাবুর চাচা সতিয়া বাবু প্রমুখদেরকে। বাবু গঙ্গাধর জালানের সহায়তায় রাধা বিনোদ বাবুদের জায়গা-জমি জনাব খবির মিয়ার একান্ত প্রচেষ্টায় বিনিময়ের মাধ্যমে বালিকা বিদ্যালয়ের নামে করা হয়।

সতিয়া বাবু প্রথমে চাঁদা তোলার কাজ করতেন অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে। গান-বাজনার আসর বসিয়ে, সার্কাসের আয়োজন করে প্রতিষ্ঠাকালিন তহবিল সংগ্রহ করা হতো। ঝিনাদহের তাহেরহুদা ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান জনাব মোফাজ্জেল হোসেন ভবানীপুর বাজারে যাত্রা-পালা বসিয়ে সেখান থেকে সংগৃহীত অর্থ স্কুলের উন্নয়নের জন্য দিয়েছিলেন। এনামুল হক নামের বিখ্যাত সাইক্লিস্ট টানা সাত দিন ধরে সাইকেল চালিয়ে আলমডাঙ্গাবাসীকে মাতিয়ে রাখেন। সেখান থেকে অর্জিত অর্থ স্কুলের উন্নয়নে কাজে লাগানো হয়। পরবর্তীতে সরকারি অনুদান পাওয় গেছে। এককথায় নাগরিকজনের প্রতিষ্ঠান এই বালিকা বিদ্যালয়।

এখন আমরা বাম দিকের যে ভবন (তখন ছিল একতলা, পরে গিরিধারি লালা মোদীর সহায়তায় দোতলা করা হয়) এবং দোতলা অফিস ভবন (শ্রেনিকক্ষ সহ) দেখি সেগুলোর নির্মাণ কাজ শুরু হয় দেশ স্বাধীন হওয়ার পর। অফিস ভবনের দোতলার কাজ শুরু হয় ১৯৭৪ সালে এবং শেষ হয় ১৯৯৭৫ সালে। এর আগে বর্তমান অফিস বিল্ডিঙের বিপরীতে একটা টিন শেড বিল্ডিং তৈরি করা হয়, যা আশির দশকের প্রথম ভাগে পরিত্যাক্ত হয়ে যায় এবং পরিত্যাক্ত অবস্থায় দীর্ঘদিন পড়ে ছিল।

প্রথম প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ত্ব পালন করেন পাইকপাড়ার জনাব রহিম উকিল। পরে ১৯৬৮ সালে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ত্ব গ্রহন করেন জনাব লতাফত হোসেন, যিনি আলমডাঙ্গা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়েও শিক্ষকতা করেছেন। জনাব লতাফত হোসেনের সময় থেকে স্কুলটির আধুনিকায়ন শুরু হয়। শুরুর দিকে রেলওয়ে স্টেশনের বুকিং ক্লার্ক জনাব কলিমুদ্দিন মিয়াও কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন, শিক্ষকতা করেছেন জনাব রবকুল উকিল সাহেব এবং কালিদাসপুরের একজন শিক্ষকও (যার নাম জানা যায়নি)।

জনাব খবির উদ্দিন মিয়ার পর দীর্ঘদিন ধরে স্কুলের পরিচালনা কমিটির দায়িত্ব পালন করেছেন ডঃ আব্দুল হামিদ। ১৯৭২ পরবর্তী সময় থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন তিনি । তাঁর সাথে ছিলেন জনাব আবু মুসা মোল্লা, জনাব আফাজ মিয়া, মিসেস সুফিয়া জোয়ারদার, বিমল বাবু প্রমুখ। তাঁদের এবং পরবর্তী যারা বিভিন্ন দায়িত্বে এসেছেন তাঁদের সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বিদ্যালয়টি এখন একটি বিরাট মহীরুহে পরিণত হয়েছে।

(নানা জনের কাছ থেকে শুনে সেই সব তথ্যের ভিত্তিতে এটা লেখা হয়েছে. যেহেতু এই বিষয়ে তেমন কোন আকর গ্রন্থ নেই তাই অনেকের নাম, তথ্য ইত্যাদি বাদ পড়ে যেতে পারে। এই বিষয়ে কোন মন্তব্য্ থাকলে কমেন্টস বক্সে দেওয়ার জন্য্ অনুরোধ করা হলো। আপনাদের দেওয়া তথ্য আমরা সংযুক্ত করে নেব। ধন্যবাদ।