সেই সময়ঃ শীত নিদ্রায় যাওয়ার আগে স্মৃতিকাতরতা

136
সেই সময়ঃ শীত নিদ্রায় যাওয়ার আগে স্মৃতিকাতরতা
আলমডাঙ্গা লাল ব্রিজ

অনেক আগে, আমার জন্মেরও অনেক আগে বড় মাঠে (আলমডাঙ্গা এটিম মাঠ) আয়োজিত ফুটবল লিগগুলোতে ঢাকা-কলকাতা থেকে ফুটবল খেলোয়াড় হায়ার করে আনা হতো। আলমডাঙ্গার কিছু বিত্তশালী পরিবার তাদেরকে নিয়ে আসতো। সেই সব পরিবারের অনেক সদস্য ভাল খেলোয়াড় এবং এথলেট ছিলেন। তাঁদের সাথে যোগ দিতেন সাধারণ পরিবার থেকে আসা ভাল খেলোয়াড় এবং এথলেট গণ। আলমডাঙ্গার সামাজিক শক্তিগুলো সংগঠিত হওয়া শুরু হয়েছিল তখন থেকেই।

যখন বুঝতে শিখেছিলাম তখন দেখেছি অনেকগুলো ক্লাব ছিল আলমডাঙ্গায়। ফ্রেন্ডস ক্লাব, ব্রাদার্স ইউনিয়ন, টাইগার ক্লাব, রেইনবো ক্লাব, টারজান ক্লাব, গোবিন্দপুরের সোনালি সংঘ এগুলো ছিল নামকরা। এছাড়া প্রায় সব গ্রামেরই একটা নিজস্ব একাদশ ছিল। কোন কোন গ্রামে একের অধিক একাদশও ছিল। খেলা যায় এমন সব জায়গায় বিকাল বেলা কোন না কোন খেলা নিয়ে শিশু-কিশোর-তরুণরা মেতে থাকতো। নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে ছোট বড় ফুটবল, ক্রিকেট বা ব্যাডমিন্টন লীগের আয়োজন করতো। ইন্টার স্কুলের খেলাগুলো নিয়ে ছিল মাতামাতি। সবগুলো ক্লাব থেকে যাচাই করে ভাল সেরা খেলোয়াড় নিয়ে গঠিত হতো আলমডাঙ্গা একাদশ।

আশির দশকে আলমডাঙ্গা ডিগ্রী কলেজটি হয়ে উঠেছিল সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রান কেন্দ্র। কবিতা পাঠ, গান, পথ নাটক, মঞ্চ নাটকের নিয়মিত আয়োজন ছিল। লিটল ম্যাগ, সাহিত্য পত্রিকাও প্রকাশিত হয়েছিল বেশ কিছু। সব চেয়ে সৌভাগ্যের বিষয় ছিল এটা যে আলমডাঙ্গার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর প্রতিবাভান কর্মীরা তখন আলমডাঙ্গা ডিগ্রী কলেজে পড়াশোনা করতেন। আর যারা আলমডাঙ্গার বাইরে থাকতেন তাঁরাও কোন না কোন ভাবে একটা নিবিড় যোগাযোগা রাখতেন।

বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক একাডেমী, দর্পণ থিয়েটার, নাগরিক নাট্যদল, আলমডাঙ্গা কলা কেন্দ্র, মুক্তিযোদ্ধা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, স্বয়ম্ভর ক্রীড়া কুঠি, ফ্রেন্ডস থিয়েটার সহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত সাংস্কৃতিক চর্চা হতো। সাংস্কৃতিক সন্ধ্যে, নাট্যোৎসবের নিয়মিত আয়োজন ছিল। এখন এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোরই কার্যক্রম চোখে পড়ে না। দুই একজন মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণে দু’একটি প্রতিষ্ঠান টিকে আছে এবং জাতীয় পর্যায়ে কিছু সফলতাও পেয়েছে।

ব্যায়ামাগারটির অবস্থাও স্ব্যাস্থ্যকর না। কিন্তু একটা সময় এটার জৌলুস ছিল ঈর্ষা করার মত। সকাল বিকাল এখানে সব বয়সের মানুষ শরীর চর্চা করতেন। আশির দশকের কোন এক সময়ে (সালটা মনে করতে পারছি না) কুষ্টিয়া ব্যায়ামাগারের সাথে আলমডাঙ্গা ব্যামায়াগারের একটা প্রতিযোগিতা হয়েছিল। ভারোত্তোলন, শরীর প্রদর্শন, বক্সিং এগুলো নিয়ে দু’পক্ষের প্রতিযোগিতা। তখন বুলবুল কাকু ছিলেন তখন ন্যাশনাল পর্যায়ের বক্সার।

Ip Man এর শ্রেষ্ঠ ছাত্র, মার্শাল আর্টের কিংদন্তি Bruce Lee মারা যান আশির দশকের কাছাকাছি সময়ে। Bruce Lee ছিলেন তরুদের মধ্যে অনেক জনপ্রিয়। সম্ভবত তাঁর সিনেমাগুলোর কারণে মার্শাল আর্ট সারা পৃথিবীতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তখন আলমডাঙ্গায় মার্শাল আর্ট চর্চা বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। জাতীয় দিনগুলো মার্শাল আর্টের কলাকৌশল দেখার জন্য সব বয়সের মানুষ ভিড় করত।

ধর্ম সভাগুলোকে ঘিরেও উৎসবের দেখা যেত আমেজ। ধর্ম আলোচনার জন্য বড় কোনো আলেম আসবেন- এখবর ছড়িয়ে পড়লে মানুষ প্রস্তুতি নিতে শুরু করতো। অনেক মানুষ ছুটে যেতেন সভা স্থলে। তাঁদের মধ্যে অন্য রকম একটা প্রাণের ছবি দেখা যেত। ধর্মসভা শেষে মুখে প্রশান্তির চিহ্ন নিয়ে ঘরে ফিরে যেতেন। সবার মুখ হয়ে উঠতো ধর্মপ্রাণ মানুষের মুখোচ্ছবি।

যারা এসব কাজের পেছনের কুশিলব হিসাবে কাজ করতেন তাঁদের মত পথ রাজনৈক পরিচয় এক ছিল না। কিন্তু এসব কাজের সময় সব কিছু ভুলে তাঁরা এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে পড়তেন। এটাকেই মনে হয় বলে সামাজিক শক্তি।

অনেক ভালো ভালো খেলোয়াড়ের নাম, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের নাম, প্রতিষ্ঠানের নাম এই উল্লেখ করা যেত। কিন্তু শুধু বক্সার বুলবুল কাকুর নাম উল্লেখ করেছি। স্মৃতিতে অনেকের নাম আছে, সবার নাম লিখলে এই লেখার পরিধি অনেক বেড়ে যেত। আবার অনেকের নাম বাদ পড়ে যাবার সম্ভবনাও থেকে যেত।