আমাদের যুদ্ধদিনে ব্যারিস্টার বাদল রশীদ

161
আমার দেখা ব্যারিস্টার বাদল রশীদ ।
ব্যারিস্টার বাদল রশিদ

বাদল ব্যারিস্টার

ব্যারিস্টার বাদল রশীদ। আলমডাঙ্গাতে যিনি ‘বাদল ব্যারিস্টার’ নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন। এখনও এই নামেই মানুষ তাঁকে ডাকতে বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করে। তাঁর কর্মজীবন রাজনৈতিক জীবন অনেক বেশি বৈচিত্রময়, গৌরবময় এবং ঘটনাবহুল। বড্ড বেশি সাদাসিধে জীবন যাপন করতেন, থাকতেন মাটি ও মানুষের খুব কাছাকাছি। নিজেকে ‘মেঠো ব্যারিস্টার’ হিসাবে পরিচয় দিতেন অবলীলায়। তাঁর কাছে যাওয়া যেত খুব সহজেই।

আইন চর্চা করলে তিনি বাংলাদেশের অনেক নামী সফল ব্যারিস্টারের মতই অত্যন্ত স্বচ্ছল এবং ঝলমলে জীবন যাপন করতে পারতেন কিন্তু তিনি সেই পথে হাঁটেন নি। ‘দেশের উন্নয়ন করতে হলে গ্রামের উন্নয়ন করতে হবে’ এই কথাটিকে সত্য মেনে তিনি গ্রামে ফিরে এসেছিলেন এবং গ্রামেই থেকে গিয়েছিলেন আজীবন। রাজধানীর ঝলমলে জীবন তাঁকে টানেনি।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভুমিকা

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসামান্য ভুমিকা ছিল। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের স্বীকৃতির জন্য, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত তৈরির জন্য এবং তহবিল সংগ্রহের জন্য তিনি নিরলস কাজ করেছিলেন, সফল হয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে তাঁর ভুমিকার কথা কিছুটা জানা যায় রাজু কাকার (রাজ কুমার রামেকা) লেখা ‘আলমডাঙ্গা উপজেলা পরিচিতি’ নামক বইটি থেকে। বইটিতে তাঁর সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য জানা যায় তবে এখানে শুধু রাজু কাকা ব্যারিস্টার বাদল রশীদের যে ছোট্ট সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন তার কিছু তথ্য নিয়ে আলোচনা করব।

সাক্ষাৎকারটি থেকে জানা যায়, তিনি ‘অল ইন্ডিয়া ডক শ্রমিক ফেডারেশানের’ তৎকালীন সেক্রেটারি মিস্টার কূলকী নায়ারের সাথে যোগাযোগ করেন এবং বাংলাদেশের যুদ্ধ পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁকে বিস্তারিত জানান। মিস্টার নায়ার ‘অল ইন্ডিয়া ডক শ্রমিক ফেডারেশানের’ একটা সভা আহ্বান করেন এবং ব্যারিস্টার বাদল রশীদ সেই সভায় বাংলাদেশের যুদ্ধ পরিস্থিত সম্পর্কে অল ইন্ডিয়া ডক শ্রমিকদেরকে অবহীত করেন।

‘অল ইন্ডিয়া ডক শ্রমিক ফেডারেশান’ মিস্টার নায়ারকে এই বিষয়ে ‘আন্তর্জাতিক ডক শ্রমিক ফেডারেশানের’ সাথে কথা বলার জন্য দ্বায়িত্ব প্রাদান করে, যার সদর দপ্তর ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। মিস্টার নায়ার ছিলেন ‘আন্তর্জাতিক ডক শ্রমিক ফেডারেশানের’ একজন সদস্য। তিনি ‘আন্তর্জাতিক ডক শ্রমিক ফেডারেশানের’ মাধ্যমে ‘আমেরিকান ডক শ্রমিক ফেডারেশান’কে বাংলাদেশর যুদ্ধের বিষেয় অবহিত করেন। ফলে মার্কিন ডক শ্রমিকরা পাকিস্থানী জাহাজে War Raw Materials বোঝাই করতে অস্বীকার করে।

পরে মার্কিন সাধারণ জনগণ পাকিস্থানের কাছে অস্ত্র বিক্রি না করতে নিক্সন সরকারের উপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করে। এরপর মার্কিন সরকার পাকিস্থানকে অস্ত্র সাহায্যের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারেনি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল সব শ্রেনি পেশার মানুষের অংশগ্রহণে সংগঠিত একটি বহুমুখী যুদ্ধ।

এখানে শিল্পী এবং সাংস্কৃতিক কর্মীদের একটা বড় ভুমিকা ছিল। বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক দলের নেতা হিসেবে তিনি সাংস্কৃতিক আন্দোলন বেগবান করার জন্য শান্তিনিকেতনের তৎকালীন উপাচার্যের সাথে দেখা করেন এবং দুই দেশের শিল্পীদের সাথে সমন্বয় সাধন করেন।

তিনি আপেল মাহামুদ, আব্দুল জব্বার, নমিতা ঘোষ, দিলিপ সোম, মকছেদ আলী শাহ, বিনাশ শীল, রমা ভৌমিক ইত্যাদি বাংলাদেশের জনপ্রিয় শিল্পীবৃন্দ এবং ভারতীয় অনেক শিল্পীবৃন্দদের নিয়ে ভারতের প্রধান প্রধান শহরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন এবং তা থেকে উপার্জিত অর্থ জয় বাংলা অফিসে জমা করেন। জমাকৃত অর্থ মুক্তিযুদ্ধের কাজে ব্যায় করা হয়েছিল।

বাংলাদেশের রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া নিয়ে তিনি কাজ করেছিলে। এর জন্য তিনি ভারতের তৎকালীন প্রাধান মন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর সাথে দেখা করেন। মিসেস গান্ধী তাঁকে দিল্লী জামে মসজিদের প্রধান ইমামের সাথে কথা বলতে পরামর্শ দেন। মিসেস গান্ধী সম্ভবত ভারতীয় মুসলমানদের জনমতকে বাংলাদেশর পক্ষে আনার জন্য তাঁকে এই পরামর্শ দিয়েছিলেন। এই বিষয়ে তিনি (ব্যারিস্টার বাদল রশীদ) দিল্লী জামে মসজিদের প্রধান ইমামের সাথে কাজ করেছিলেন এবং সফল হয়েছিলেন।

সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তিনি কেন প্রায় সব জায়গাতেই গিয়েছিলেন? উত্তরে তিনি হেসে বলেছিলেন, ‘আরে বাপু, আমি তখন সদ্য লন্ডন ফেরত। ইংরেজি ভাষায় কথা বলা আমার জন্য সহজ ছিল। সেজন্য আমাকে জোর করে বলা হত বাদল ভাই, আপনি না গেলে হবে না।‘

সাক্ষাৎকারের শেষ প্রশ্নটি ছিল, ‘আপনি মন্ত্রী হতে পারলেন না কেন? তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘আরে বাপু, আমি কলকাতার অফিসে কাজকাম করতাম। সেখানকার কাগজপত্র বুঝ করে অন্যান্য কাজ শেষ করে দেরীতে এসেছিলাম। দেরীতে আসার জন্য দেখা গেল সব দপ্তর বন্টন হয়ে গেছে। মন্ত্রীত্ব না পেলেও বঙ্গবন্ধু আমাকে কখনও দূরে সরতে দেননি। তিনি সব সময় বলতেন, বাদল ভাই, আপনে সব সময় আমার কাছে কাছে থাকবেন,।‘

তিনি কাছে কাছেই ছিলেন। রাষ্ট্রীয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজে অংশ গ্রহণও করেছিলেন (সেগুলো নিয়ে পরের কিস্তিতে লিখবো)। তাঁর সবচেয়ে অসাধারণ কাজটি হচ্ছে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নে তাঁর ভুমিকা। তিনি বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য ছিলেন যা বাহাত্তরের সংবিধান নামে খ্যাত।

সুত্রঃ আলমডাঙ্গা উপজেলা পরিচিত, রাজ কুমার রামেকা।