ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ; ভয়ঙ্কর দু’টি নীরব ঘাতক (পর্ব-০২)

334
ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ

ডায়াবেটিসে আক্রান্তের হার বাড়ছে কেন? ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ; ভয়ঙ্কর দু’টি নীরব ঘাতক (পর্ব-০১) -এ আমি বলেছিলাম ডায়াবেটিসে আক্রান্তের হার প্রতিনিয়তই বাড়ছে। বাংলাদেশে প্রতি ১১ জনে ১ জন মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, কেন বাড়ছে এই হার?

কেন বাড়ছে ডায়াবেটিস?

গবেষকরা বলছেন, নগরায়ন, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন আর কর্মবিমুখ জীবনধারা অর্থাৎ শারীরিক পরিশ্রম না করাই এর প্রধান কারণ। বাংলাদেশী মানুষের মধ্যে ডায়াবেটিসের দুটি বড় কারণ হ’ল কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা নির্ভর খাদ্যাভাস এবং কর্মবিমুখ জীবনধারা।

অন্যান্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে জেনেটিকস বা বংশগত প্রভাব, শরীরের অতিরিক্ত ওজন বা স্থুলতা, অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও ধুমপান করা। গর্ভবতী মায়েদের এবং যেসব শিশু গর্ভকালীন ও অল্প বয়সে অপুষ্টির শিকার হয় তাদের মাঝে ডায়াবেটিসের প্রবণতা লক্ষ্যণীয়। এছাড়া বয়স বাড়ার সাথে সাথেও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে।

গবেষণায় দেখা যায় যে গত এক দশকে ২৫ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়স্ক বাংলাদেশীদের মধ্যে শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ৩৫%-৩৮% পর্যন্ত বেড়েছে। একটু চিন্তা করলেই দেখবেন, আমাদের জীবন আজ যন্ত্র নির্ভর হয়ে গেছে। গল্প শুনেছি, আমাদের নানা-দাদারা অনেক দূর-দুরান্ত পর্যন্ত পায়ে হেটে গিয়েছেন। আর আমরা সামান্য দুর হলেও হেটে যাওয়ার কথা চিন্তাও করি না।

আমাদের খাদ্যাভাসের ব্যাপারটাও লক্ষণীয়। ফাস্টফুডের প্রতি আমাদের আকর্ষণ বাড়ছে। প্রতিদিনের খাদ্যের তালিকায় প্রাধান্য পাচ্ছে শর্করা ও চর্বি জাতীয় খাদ্য। এছাড়া খাদ্যে ভেজাল আজকালের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিশুরা এখন খেলার মাঠ ছেড়ে মোবাইল বা কম্পিউটার গেইমিং এ আসক্ত হয়ে পড়ছে। শিশুকাল থেকে এই ঘরাবদ্ধ জীবন তাদের মানুষিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে এবং বড়দের পাশাপাশি তাদেরও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।

ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফাউন্ডেশনের হিসাব মতে, বাংলাদেশে ১৭ হাজারেরও বেশি শিশু ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।

ডায়াবেটিসের লক্ষণসমূহঃ

ডায়াবেটিসের লক্ষণসমূহ সম্পর্কে ধারনা থাকা খুবই প্রয়োজন। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে এবং চিকিৎসা নিলে যেকোনো ধরনের গুরুতর জটিলতা প্রতিরোধ করা যায়।

ডায়াবেটিসের প্রধান লক্ষণগুলো হচ্ছে :

ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ
ডায়াবেটিসের লক্ষনসমুহ। Image Source: Freepik.com
  • ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, বিশেষ করে রাতের বেলা –
  • বেশি বেশি পানি তৃষ্ণা পাওয়া
  • খিদে বেড়ে যাওয়া
  • প্রচুর খাওয়ার পরও ওজন কমে যাওয়া এবং ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাওয়া
  • শারীরিক দূর্বলতা
  • অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে পড়া
  • ঘন ঘন বিভিন্ন ধরনের জীবাণুজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়া এবং সহজে সুস্থ না হওয়া
  • ঘা বা ক্ষতস্থান সহজে না শুকানো

তবে মনে রাখা প্রয়োজন, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যাক্তির এসব লক্ষণ নাও থাকতে পারে।

ডায়াবেটিসজনিত জটিলতাসমূহঃ

আসুন, এবার জেনে নিই ডায়াবেটিসের চিকিৎসা না করলে আমাদের কি ধরনের সমস্যা হতে পারে অর্থাৎ ডায়াবেটিসজনিত জটিলতাসমূহ কি কি?

রক্তনালী সংক্রান্ত জটিলতা

ডায়াবেটিস মূলতঃ রক্তনালীর রোগ। আপনারা জানেন, আমাদের সারা শরীরের প্রতিটি জায়গায় রক্তনালী বিদ্যমান। তাই ডায়াবেটিসে ক্ষতি হয় না এমন কোন জায়গা নেই। দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে যে কোন সময় ঘটতে পারে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোকের মত কঠিন দুর্ঘটনা যা থেকে হতে পারে মৃত্যু।

হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক

একবার হার্ট অ্যাটাক হলে অনেক গুলো ঔষধ যতদিন বাঁচবেন ততদিন খেয়ে যেতে হবে, তারপরও আগের মত কাজ করতে পারবেন না। একবার স্ট্রোক হলে হারিয়ে ফেলতে পারেন বাকশক্তি (কথা বলার ক্ষমতা) বা হাত পায়ের শক্তি যা চিকিৎসা নিলে হয়ত পরবর্তীতে উন্নতি হতে পারে কিন্তু পূর্বের মত শক্তি কখনোই ফিরে পাবেন না।

অন্ধত্ব

বিশ্বব্যাপী অন্ধত্বের একটি প্রধান কারণ এই ডায়াবেটিস। ডায়াবেটিসের কারণে মানুষ ঝাপসা দেখা থেকে শুরু করে এক সময় অন্ধও হয়ে যেতে পারেন। গবেষণায় দেখা গেছে সাধারণ রোগীর তুলনায় ডায়াবেটিসের রোগীর অন্ধত্বের ঝুঁকি প্রায় ২৫ গুন বেশি।

অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের কারণে হারাতে পারেন কিডনীও। ক্ষুধামন্দা হতে শুরু করে রক্তস্বল্পতা, সারা শরীরে পানি জমা এবং চিকিৎসা না করলে মৃত্যুই যার পরিণতি। হাত পায়ের রক্তনালীর রক্ত প্রবাহ কমে গিয়ে হাত-পা জ্বালা পোড়া/কামড়ানো থেকে শুরু করে পচন ধরা, এমনকি কেটে ফেলা পর্যন্ত লাগতে পারে এই অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের কারণে। ঠিক এভাবেই ডায়াবেটিস হয়ে উঠেছে বিশ্বব্যাপী মৃত্যু আর অঙ্গহানির প্রধান কারণ।

(চলবে)