অনন্ত রাত্রি

102
অনন্ত রাত্রি
আলমডাঙ্গা রেল স্টেশান

রাত দশটা। আলমডাঙ্গা রেলস্টেশানে তাঁর পাশে আমি দাঁড়িয়ে আছি। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি। গাঢ় অন্ধকার রাত। তাতে আবার দমকা হাওয়া এবং অন্যান্য সব মিলিয়ে পরিবেশটা স্যার আরথার কোনান ডয়েলের কোন একটা গোয়েন্দা কাহিনীর দৃশ্যের মত হয়ে উঠেছে। স্টেশানে মাত্র দুই-চারজন লোক। তারা তাদের মত বসে আছে চুপচাপ।

আমরা যাব তাঁর গ্রামের বাড়িতে। স্টেশান হতে মাইল তিনেক দূরে। রিক্সা বা রিক্সা-ভ্যান সবসময়ের সাথী। কিন্তু আজ কিছুই নেই। কেউ একজন রিক্সা ডাকতে চাইলো। তিনি বাঁধা দিয়ে বললেন,’দরকার নি ডা’কি আনার। হাঁটিই যায়’।

যেই বলা সেই কাজ। জুতাজুড়া ছুড়ে ফেললেন। লুঙ্গিটা ভাঁজ করে নিলেন, তারপর একবারে ছুট। মুহূর্তে ব্যাপারটা বুঝে আমিও বৃষ্টিতে নেমে গেলাম। রেললাইন বরাবর তিনি হাঁটছিলেন। অন্ধকার তাঁর গতি কমাতে পারেনি। পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখলাম কে একজন হারিকেন নিয়ে দৌড়াচ্ছে। তিনি বললেন, “হাঁট, হাঁট, অন্ধকারে হ্যারিকেনই কি সব?” হারিকেন পেয়ে স্বস্তি বোধ করলাম। এবার জুতা এবং ছাতা নিয়ে একজন দৌড়াচ্ছে। তিনি বললেন, “বৃষ্টি কি আমাগের দুশমন?”

ছাতাটা মেলে ধরলেও তাঁকে আটকিয়ে রাখা দায়। হাঁটছিলেন তো না, যেন দৌড়াচ্ছিলেন। রাস্তার কোন পাশে যে কখন চলে যাবেন তাঁর ঠিক নেই। হঠাৎ রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়লেন। নিজে নিজেই বলেলন, “রাতটায় খাওয়া যাবেন কি? বাড়িততো কেউ নেই।” দুই কদমে সড়কের কিছু ডানে গেলেন। তারপর বন্ধ দোকানটায় হাত চাপড়ালেন ও ডাকলেন,”ইসু, ঘুমি পড়লি নাকি? আমি। এই আলাম।ডিম আছে? দু’একটা দরকার ছিলু যে।“

বলে আর দাঁড়ালেন না। আবার ছুটতে শুরু করলেন। আমার মত তাঁরও নিশ্চয় বেশ ক্ষিদে পেয়েছে। একটু দাঁড়ালেই তো ডিম মিলে যেত। মনের কথা মুখে আসলেও অন্তত এইসব ক্ষেত্রে কাজ হয় না জানি। তাই চুপ থাকলাম। তাঁর বাম হাতটা আমার দুই কাঁধ বরাবর ছড়িয়ে ছিল। খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে আমরা হাঁটছিলাম। হারিকেনের আলোতে একবার দেখলাম, বৃষ্টির পানির অবিরাম ধারায় তাঁর পেট বেয়ে পড়ছে। পাঞ্জাবিটা একেবারে ভিজে গেছে। এইসবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে লাভ নেই এবং করারও কিছু নেই। আমি শুধু ভাবছিলামঃএই পথচলার যদি শেষ না হতো!

আমরা হাঁটছি। এবার দেখা পেলাম একটা সাপের। তবে মরা। ইট ছুড়ে কারা মেরে রেখে গেছে। এই প্রসঙ্গটাও এড়ালো না। তিনি বললেন, “গরমের সময় সন্ধ্যার পর সাপ বের হয়। তবে মন্ত্রটন্ত্র কিছু না। ডালিম গাছের শিকড় ধ’রি দে’কু, সাপ ফনা নামি ফ্যালাবে। ছোট বেলায় এইসব কত করিচি। সাধে কি আমার নাম পড়েছিল ………

সাইকেলের বেল শুনে থামলাম। দোকানদার ইসু ডিম নিয়ে এসেছে। দুই পকেটে ডিম চারটে ঢুকিয়ে তিনি আবার হাঁটতে লাগলেন। আমার বুকের মধ্যে হাহাকার জেগে উঠল। পথ তো ফুরিয়ে এল। এমন হাত-জড়ানো সান্নিধ্যটুকু হারিয়ে ফেলতে হবে, তাই। পায়ে চলার পথ যত দীর্ঘই হোক- ফুরায়। আমার পথও ফুরিয়েছিল। কিন্তু অনুভূতিটুকু হারিয়ে যায় নি।