যাত্রাপালার ঝংকার।

152
যাত্রাপালার ঝংকার

হ্যারিকেনের টিমটিমে আলোক শিখা তখন বাতাসে দোদুল্যমান বাতাসের ঝাপটা এসে কখনো ডানদিকে আলোচ্ছটা নাচে কখনো বামদিকে । ভিষণ রাগ ওঠে, বাঁশ বাগানের মাথা থেকে রুপালী ভরাট পুর্নিমার চাঁদ বাঁশের পাতাকে রুপ দিয়েছে অসুরের হাতের তরোয়ালের মতন। বয়সের ভার তখন পাড়ার সমবয়সী ছেলেদের একত্র শক্তির উপর নির্ভর। একজন দৌড়ে পালালে সকলের পালাতে হবে ।

ইথারের তরঙ্গ দূরে থেকে ক্রমশ সন্নিকটে আসীন বেজে চলছে অপেরার / যাত্রাপালার শুভারম্ভের মাতাল করা সূর।

এত কিছু বুঝিনা তবুও দেখার বাসনা রাজার পোশাক, মুকুট আর তরবারী। শীতের রাতে গাও গেরামের হাজারো শ্রোতা চাদর আর মাফলাটে মুখ ঢেকে জায়গা জুড়েছে। রাজা আসলেন মন্চে শুরু হলো অমিয় কথার বন্যা নিস্তব্ধ হয়ে শুনছি।

” যে মনসার আইলের কোলে বসে চেং – বেঙ ধরে খায় তার পুত্র লখীন্দরের সাথে আমার মেয়ের বিয়ে না- না- নাহ এ হতে পারেনা “

কত বাহারী রুপ ঝলকানির পোশাক আমার ও গায়ে পরতে ইচ্ছে হয় মুহুর্তেই নিজেকে ভেবে নিই তার জায়গায়।

একজন মাস্টার বই ধরে, ধরে বুলি আউড়ে চলছেন তার সাথে, সাথে নটবরেরা পোষা ময়না পাখির মত বুলি আউড়ে চলছে। সাথে ঢোল, খঞ্জরী আর সানায়ের সুর। কে জেনো গাঢ় মেখাপে ছেলে থেকে মেয়ে সেজেছে বোঝায় মুশকিল। ইয়া বড় এক কাঠের রামদা নিয়ে টিংটিঙে এক লোক মঞ্চে এসে বলছে কেও কি আছো আমার সাথে লড়বে…? আরেক টিংটিঙে রোগাকার লোক এসে বলছে আছে, আছে বনহুর আছে।


৮০/৯০ এর দশকে গ্রাম থেকে গ্রামান্তর শীতের রাত্রে অভিনীত হয়েছে গ্রামবাংলার কল্পকাহিনি নির্মিত অসংখ্য যাত্রা । যা সময়ের ব্যাবধানে আজ দুর্লভ এবং হারিয়ে যেতে বসা আমাদের সংস্কৃতির মুল উপজীব্য।
কালক্রমের অবগাহনে ডুবতে বসা এই সংস্কৃতি জানিনা ফিরে আসবে কিনা তবে ঐই সময়ের সকলেই মুগ্ধ নয়নে পিছনে ফ্লাসব্যাক করে ফিরে যাবেন হয়তো ক্ষনিকের অবছন্নতায়।

রমরমা এসব যাত্রাপালা আলমডাঙ্গার সকল গ্রামে একসময় পরিলক্ষিত হতো আজ মন্দায় পড়েছে এসকল চোখ ধাধানো মানুষের মনকে নাড়া দেবার অভিনয় ।

আলমডাঙ্গা তে নাগরিক নাট্যদল একদা আশার মুখ দেখিয়েছিলো এ অঞ্চলের মানুষের হৃদয়ে আজ সেটাও মুখ থুবড়ে পড়ে থাকার মতন অবস্থায়। এ অঞ্চলে একদা অমল ডাক্তারদের মত গুনী অভিনেতার জন্ম হয়েছিলো। আজ আমরা অনেক দুরে প্রজন্মান্তরের সীমানায় রঙীন পর্দায় তবু্ও মন আমাদের আর নেচে ওঠে না। আমরা হারাতে চায় মুগ্ধতায় সেই মুগ্ধতায় যা এখন আর পাইনা। নারী – পুরুষের বিভেদ ভুলে সকলেই অপলক দৃষ্টি মঞ্চের দিকে নিরিখ হয়না। হারিয়েছে সেই যাত্রাপালা সাথে রাজরাজার ঝলমলে মখমলের পোশাক, মুকুট আর তরবারি।