মোড়ভাঙ্গার রসগোল্লা গাঁথা।

122
মোড়ভাঙ্গার রসগোল্লা গাঁথা।
মোড়ভাঙ্গার রসগোল্লা

বাঙালির রসনা বিলাসে রসগোল্লা অন্যতম অনুষঙ্গ। নানা রকম ফিউশান মিষ্টির ভিড়ে রসগোল্লার কদর এতটুকুও কমে নি। এক সময় আলমডাঙ্গার মানুষের রসনা-বিলাসের অনুষঙ্গ ছিল রসে টইটম্বুর মোড়ভাঙ্গার রসগোল্লা; যা মুখে দেওয়ার সাথে সাথে মুখের মধ্যে মিলিয়ে যেতো; চামচ দিয়ে কাটলে ভেতরটাতে দেখা যেতো মৌমাছির চাকের আকার । রস ছিল নির্মল, স্বচ্ছ। সেই রস শুধু সুস্বাদুই ছিল না, ছিল উপকারি গুণও। অনেকেই কিছু কিছু পেটের পীড়ায় টোটকা হিসেবে ব্যবহার করতেন মোড়ভাঙ্গার রসগল্লার রস।

আনুমানিক ষাটের দশক কিংবা তার আগে থেকেই আলমডাঙ্গার মোড়ভাঙ্গা গ্রামে নিশিত পাল ও শুনিত পাল পারিবারিক ভাবে পাশাপাশি দুটি দোকান করে বিভিন্ন রকম মিষ্টি নিজে হাতে বানিয়ে বিক্রি করতেন। তাদের বানানো মিষ্টির মধ্যে রসোগোল্লা এবং খটি দুধের তৈরি সন্দেশ মানুষের কাছে বেশী প্রিয় হয়েছিল। দূর-দুরান্ত থেকে ছোট বড় সব বয়সের মানুষ মোড়ভাঙ্গায় আসতো রসগোল্লা এবং সন্দেশের স্বাদ নিতে।

মোড়ভাঙ্গার রসোগল্লার রস তৈরি করতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হতো শুকনা বাবলা গাছের কাঠ এবং রস অর্থ্যাৎ চিনির সিরা তৈরির পদ্ধতিও ছিল প্রচলিত সিরা তৈরির পদ্ধতি থেকে ভিন্ন। যার জন্য সময় যেমন লাগতো তেমন মিষ্টিও এক খোলায় এক থেকে দেড় কেজির বেশি হতো না। দেশি গরুর দুধ দিয়ে বাড়িতে ছানা তৈরি করতেন নিশিত পাল ও
শুনিত পাল । একটা ছোট্ট ঘটনা না বললে মোড়ভাঙ্গার রসগোল্লার স্বাদ হারিয়ে যাওয়ার কারণ অজানাই থেকে যাবে। তাই সেই দিনের বিবরণ তুলে ধরছি:

একদিন নিশিত পাল একজন কারিগরকে নিয়ে রসোগোল্লা বানাচ্ছিলেন তিনি। নিশিত পালের চোখ ফাকি দিয়ে কারিগর রস পুরোপুরি প্রস্তুত না হতেই ছানার গুটি রসে ছেড়ে দেয় । তখন তাদের কথোপকোথন ছিল এরকমঃ
নিশিত পাল: তুমি কইল্লি ডা কি?
কারিগর : কাকা রস তো হইচে….
নিশিত পাল: তুমার চিনিই তো এখনো ভালো কইরি গলি নি। চিনি যুত কইরি গলবে তারপর চিনির গাদ ( চিনির ময়লা) বের হয়ি পরিস্কার হবে। তারপর ভালো কইরি ফুটাবা তো তারপর তো গুটি ( দুধের ছানা দিয়ে বানানো রসোগোল্লার গুটি) ছাড়বা …।
কারিগর: কাকা আপনি যেভাবে বলচেন আমি সেই সময়ে দুই পাক ( দ্বিগুণ) মিষ্টি তৈরি কইরে দেবো।
নিশিত পাল : তাই বুইলি অমন গুজামিল দিয়ে কাজ করলি মিষ্টি হবেনে কিন্তু রসোগোল্লা হবে নানে। এ অনেক মেহনতির জিনিস।

নব্বই এর দশকে শুনিত পাল পরিবার নিয়ে ভারতের শিলিগুড়িতে পাড়ি জমান। নিশিত পাল পরিবার নিয়ে আলমডাঙ্গা চলে আসেন। ভারতে থাকা অবস্থায় শুনিত পাল বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন এবং তাঁর দুই ছেলে সরোজ ও উজ্জ্বল ভারতে পড়াশোনা শেষ করে প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি শুরু করেন।

অন্য দিকে আলমডাঙ্গা এসে নিশিত পাল তার পারিবারিক ব্যবসা চালিয়ে যেতে থাকেন। কিছুদিন পর রসগোল্লার নিপুণ শিল্পী নিশিত পাল হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে অকালে মারা যান। তার দুই ছেলে নিমাই ও কার্তিক আলমডাঙ্গা কাচাবাজারে তাদের পারিবারিক ব্যবসা এখনো চালিয়ে যাচ্ছেন।

নিশিত পালের ছেলেরা তাদের পূর্বপুরুষদের রসগোল্লা বানানোর কৌশল রপ্ত করলেও দেশী গরুর খাঁটি দুধ , বাবলা গাছের কাঠ আর সেই রস তৈরির মতো পর্যাপ্ত সময়ের অপ্রতুলতার কারণে সেই মোড়ভাঙ্গার রসোগোল্লা এখন ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। সমাপ্তি ঘটেছে আলমডাঙ্গার লোকজ মিষ্টান্নের এক অপূর্ব ধারার। তবে মোড়ভাঙ্গার রসগোল্লার আর সন্দেশের স্বাদ এখনও আলমডাঙ্গার অনেক মানুষের মুখে লেগে আছে।

তথ্যঃ নিশিত পালের দৌহিত্রঃ Chandan Paul