জমি

133
জমি

শহরের এইদিকে বেশ নিরিবিলি। অভিজাত পাড়ার এই এক সুবিধা।গাড়ি থাকে তো হর্ণ থাকে না।মানুষ থাকে তো কোলাহল থাকে না।ফুটপাত দিয়ে হাটছে তোতন।একটু আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে। সড়কে পানি জমে আছে।দামী গাড়ির তরুণ চালকের গতিময় ছুটে চলার কারনে কাদাপানি ছিটকে দিয়ে তোতনের পোশাক নোংরা করে গেল। মন টা নিমিষেই বিরক্তিতে ভরে যায় তোতনের।

নিম্ন মধ্যবিত্তের মন খারাপের হাজার টা উপসর্গ আসতেই থাকে। কিন্তু সমস্যা জমতে না জমতে আবার তা মানিয়ে নিতে পারে। আসলে সমস্যা মানিয়েই চলতে হয় তাদের। হাটতে হাটতে কিছুটা ঘেমে গেছে তোতন। সেই সাথে কিছুটা নার্ভাসনেসও কাজ করছে।স্কলারশিপ নিয়ে জার্মান যাচ্ছে তোতন। ইন্টারভিউ এবং আনুষাঙ্গিক কাজ শেষ করে যখন অফিস থেকে বেরুল তখন মাথায় রাজ্যের চিন্তা ঘুরপাক খায়। এতগুলো টাকা একসাথে কোথায় পাবে। মা কে ফোন করল তোতন।

মা জানিয়ে দিল, তোর বাবার ওখানে তোর তো জমির ভাগ পড়ে আছে। সেটুকু নাহয় বিক্রয় করে দে। তোতন দ্বিধায় পড়ে যায়।যার কাছে কখনও থাকা হলো না,তার জমি নিয়ে সম্পর্ক দেখানোর কোন মানে হয়। কথা না বাড়িয়ে ফোন কেটে দিল। অথচ নিরুপায়।

বাস স্ট্যান্ড গিয়ে বাসে চেপে বসে। জানালার পাশে সিট তার।বাইরের দৃশ্য কত দ্রুততার সাথে পিছনে চলে যাচ্ছে।যেন জীবনেরই প্রতিবিম্ব।বাবার মুখটা ভাবতে চেষ্টা করল তোতন।তোতন যখন খুব ছোট তখন মা বাবার মাঝে দূরত্ব তৈরী হয়।আর কোনদিনও সেই দূরত্ব এক হয় নাই।সেই থেকে নানুর বাসায় তোতন আর তার বোন তমার ঠাঁই। মাবাবার দূরত্বের কারন টা তোতন ভাল না বুঝলেও তার বড় বোন তমা বুঝত।মায়ের কাছে থাকার সুবিধার কারনে কখনও মা কে অপরাধী বলার সাহস হয় নাই তাদের।

মায়ের শেখানো শব্দে বাবা শব্দটার প্রতি তোতনের মাত্রাতিরিক্ত ঘৃণা জমেছিল।বাবা মারা যাওয়ার দিন পরীক্ষার অযুহাতে জানাযার সময় তোতন যায় নাই।এরপর বহুদিন ওসব মনে করতেও চাই না সে।বাবার ঐ বাড়ি টুকুতে তার শেষ বয়সে বিয়ে করা বৌ আর তার মেয়ে বাস করে শুনেছে তোতন। সে ভাবতে থাকে, জমি বিক্রয়ের কথা শুনলে কি মনে করবে তারা।যা মনে করে করুক,আজ তোতনের টাকা দরকার।চাহিদার কাছে মানুষ অসহায়।।

অনেকদিন পর গ্রামে আসার কারনে মানুষের কাছে জিগ্যেস করতে করতে পৌছাতে হলো। তোতন যখন বাবাহীন সেই ভিটেবাড়িতে পৌছালো, তখন দুপুর গড়িয়ে বিকাল।বাড়ির দরজায় নক করতেই ভিতর থেকে পৌঢ়া বেরিয়ে এলেন।তোতনের মুখের দিকে অনেক সময় তাকিয়ে দেখলেন।জানতে চাইলেন, কাকে চাই?তোতন ভিষণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। এমন সহজ প্রশ্নের উত্তর আজ কতটা জটিল লাগছে তার কাছে বোঝানো বড় কঠিন।

তোতন শুধু চেয়ে রইল। মহিলা নিরবতা ভেঙে আবার জানতে চাইল, কিছু বললে না তো বাবা।
এবার তোতন মুখ উঁচু করে বলল, আমি তোতন।জমির আলী….এটুকু উচ্চারণ করতেই মহিলা বলল, ভিতরে এসো বাবা। বসার ঘরে নিয়ে গিয়ে তোতন কে বসতে দেওয়া হলো। মহিলা ভিতরে গিয়ে পড়ার টেবিলে মেয়েকে জানাল, তার ভাই এসেছে। রক্তের ভাই। মহিলা আবার এসে তোতন কে ওয়াশ রুম দেখিয়ে দিয়ে ভিতরে চলে গেল।


তোতন ঘরের চারপাশে তাকিয়ে দেখছে তখন। পুরাতন চেয়ার টেবিল। একটা টেবিল ল্যাম্প, দুটো বুকসেলফ, তাতে চারশ বই হবে হয়তো। দেয়ালে প্রয়াত বাবার ছবি। এই প্রথম সে ভিতরে ভিতরে কান্না অনুভব করল।ঘৃণিত মানুষটার প্রতি টান অনুভব করল।

সেলফের উপরে ঝুলানো ছবিটার সামনে গিয়ে দেখতে লাগল। সেলফে কত লেখকের বই। বাবা এত বইভক্ত মানুষ ছিল, এটা তার জানা ছিল না। ফ্রেশ হতে সময় নিল না তোতন। এখনই তাকে ফিরতে হবে নানুর কাছে। মহিলা নাস্তা নিয়ে ঢুকল, সাথে ক্লাস নাইন পড়ুয়া মেয়ে। মহিলা তার মেয়েকে নির্দেশ দিলেন, তোমার ভাই, সালাম করো তাকে। তোতন কম কথা বলছে। অস্থিরতা কাজ করছে ভিতরে।

মেয়েটা সালাম দিয়ে তোতনের গা ঘেঁষে দাড়াল। তোতন অবাক হলো শিখার শরীরের এক বিন্দু স্পর্শে। যেন রক্তে রক্তে স্ফুলিঙ্গ। তোতন জানতে চাইল, কি নাম তোমার? ভাইয়া আমার নাম শিখা। কোন ক্লাসে পড়ো? আমি এবার নাইনে ভাইয়া। মহিলা একটু হাসলেন। ভাইবোনের আলাপের মাঝে জানালেন, শিখা ওর ক্লাসে ফার্স্ট গার্ল। তোতন শিখার দিকে আবার তাকালো। ভিতরে রক্তের টান টের পাচ্ছে আজ এতবছর পর। বাবার শেষ সন্তান শিখা আজ এত বড়! সে আর আমি একই রক্তের! অথচ কোনদিন দেখা হয় নাই!


নাস্তা শেষে সোফায় তিনজন বসে আছে, তোতন কে মহিলা জিগ্যেস করলেন। বিশেষ কিছু বলবে বাবা?
তোতনের মুখে কোন কথা নাই। তোতন নিজেকে একটু সামলে নিয়ে জানতে চাইল, আপনাদের সংসার খরচ চলছে কিভাবে? ওর পড়ালেখার খরচ, আপনার খরচ এসব কিভাবে ম্যানেজ করেন? মহিলা ভিতরে ভিতরে তোতনের মুখে মা ডাক শুনতে ব্যাকুল হলেও নিরাশ।

মহিলা জানালেন, এইতো চলে যাচ্ছে আল্লাহর নামে। এবার তোতন জানাল, তার বিদেশ যাওয়া নিশ্চিত। টাকা লাগবে বলে সে তার শরীকানা জমি টুকু বিক্রয় করতে এসেছে। মহিলা কোন প্রতিক্রিয়া জানালেন না। শুধু বললেন, তোমার অংশ তুমি বিক্রয় করতেই পার বাবা। ক্রেতা রেডি আছে তোমার? তোতন, আমতা আমতা করে বলল, না।

মহিলা বললেন, ঠিক আছে আজ থাকো, সকালে ক্রেতা দেখে দাম ঠিক করে নাও। আজ রাতটা নাহয় তোমার বাবার ঘরটায় একটু থাকবে বাবা।
তোতন কোন কথা খুঁজে পাই না।

রাতে খাবার খেয়ে বসে আছে। শিখা এলো তোতনের কাছে।
জানো ভাইয়া? আমার অনেক জানতে ইচ্ছে হত, আমার ভাইয়া কেমন দেখতে। কিভাবে কথা বলে, কি পছন্দ করে। আমার বন্ধুরা যখন কথায় কথায় তাদের ভাই কে নিয়ে গল্প করে আমি চুপ করে থাকি। আজ তোমার সাথে সেলফি পোস্ট করেছি। দেখবা? ফোনটা বের করে তোতন কে দেখায়।
ক্যাপসনে লেখা, আমার ভাই। আমার একমাত্র আশার আলো। অনেকগুলো বন্ধু কে ট্যাগ করা হয়েছে।

তোতন ভিষন জড়িয়ে পড়ে ভিতরে ভিতরে। শিখাকে ডেকে কাছে বসিয়ে গল্প করে। এক সময় তাদের গল্পের মূল উপজীব্য হয়ে পড়ে বাবার পছন্দ অপছন্দ, বাবার জীবনচরিত এসব। শিখা চলে যায় তার রুমে। তোতন একা ভাবতে থাকে, শিখা আমারই বোন, অথচ এতদিন শুধু বাবার মেয়ে বলেই জানতাম!

ঘুমানোর আগে মহিলা এসে তোতন কে জিগ্যেস করে, তোমার কত টাকা লাগবে বলতে পার বাবা? তোতন আমতা আমতা করে সংখ্যা টা জানিয়ে দেই। মহিলা বলে, এই টাকা তুমি জমি বিক্রয় করে পাবে না বাবা।তারচেয়ে আমার কথা শোনো, তোমার জমি তোমারই থাক। আমি দিচ্ছি কিছু টাকা। দেখ হয় কিনা। শিখা বড় হলে বিয়ে হয়ে যাবে। আমি মারা গেলে তুমি, তমা আর শিখা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিও। আর শোনো বাবা, আমার কিছু টাকা ফিক্সড করা ছিল। কাল তুলে এনে দিব। আশা করি তোমার চাহিদা পূরণ হয়ে যাবে।

তোতন মাথা নিচু করে এতক্ষণ শুনছিল, এবার কথা বলল। না মা, আপনি চলবেন কি করে? মা ডাক শুনে মহিলা আঁচল দিয়ে মুখটা আড়াল করলেন। আর কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, মায়ের টাকা নিতে তোর অসুবিধা কোথায় বাপ? আমি মরলে শিখা কে তুই নিজে দাড়িয়ে থেকে বিয়ে দিবি।

রাতে তোতন ঘুমাতে পারে নাই। পরদিন চলে যাওয়ার সময় বাবার উপর জমে থাকা অভিমান ধুয়ে কষ্ট নিয়ে ছোট মা কে বলল, জানো মা? বাবা কে খুব মিস করতাম! অথচ বলতে পারতাম না। আর এখন কিংবা কোনদিনও আর বলতেই পারব না।

মা কথা দিলাম, জার্মান গিয়ে সবার আগে শিখার জন্য কিছু করব। আমাকে ক্ষমা করে দাও মা, আমি অনেক দেরি করেছি শিখা কে তার ভ্রাতৃ স্নেহ দিতে।

চেক নিয়ে বেরিয়ে পড়ল তোতন। কিছু দূর গিয়ে তোতন তার মা কে কল করল। জমি বিক্রয় করে টাকা নিয়েই আসছি মা।
চোখ মুছতে মুছতে মিলিয়ে গেল তোতন যানবাহনের ভিড়ে। পিছনে শিখা আর ছোট মা দাড়িয়ে হাসছে, তোতন আবার আসবে বলে।।