আলমডাঙ্গার মিষ্টি গাঁথা।

230
আলমডাঙ্গার মিষ্টি গাঁথা।
আলমডাঙ্গার মিষ্টি

কথিত আছে, আলমডাঙ্গা শহরের গোড়াপত্তন হয়েছিল কিছু মিষ্টি প্রস্তুতকারীদের হাতে। রাজিব আহমেদ তাঁর চুয়াডাঙ্গা জেলার ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন,’কয়েকজন ময়রার হাতে এই শহরের পত্তন হয়।‘ কিন্তু কারা এই ময়রার দল? কী তাঁদের পরিচয়, কোথা থেকে তাঁরা এসেছিল কিছু আমরা জানি না। তবে আলমডাঙ্গার আশেপাশের প্রাচীন গ্রাম থেকে তাঁরা এসেছিলেন বলেই বোঝা যায়। রাজকুমার রামেকা তাঁর আলমডাঙ্গা উপজেলা পরিচিতি বইতে গাড়াল বা গণ্ডকদের কথা লিখেছেন। এই গণ্ডকরা ঘরে তৈরি করা চিড়া, মুড়ি, বাতাসা, কদমা, খাগড়াই, মুড়কি, খুরাম ইত্যাদি তৈরি করে বিক্রি করত। আলমডাঙ্গা পুরাতন বাজারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে তাঁদের বসতি ছিল। বোঝা যায় মিষ্টান্ন জাতীয় জলখাবার ছিল তাঁদের অন্যতম প্রধান ব্যবসা।

মিষ্টি প্রস্তুতকারীদের হাতে এই শহরের পত্তন হলেও নাটোরের কাঁচা গোল্লা, মেহেরপুরের সাবিত্রী, টাঙ্গাইল-রাজবাড়ির চমচম, নেত্রকোনার বালিশ মিষ্টির মত দেশবিখ্যাত কোনো মিষ্টির ব্রান্ড আলমডাঙ্গার মিষ্টি প্রস্তুতকারীরা সৃষ্টি করতে পারে নি। কেনো পারেনি সেই কারণ বিচার করার মত কোনো তথ্য পাওয়া যায় না, তবে ময়রা এবং গণ্ডকদের ধারা একেবারে বিলীন হয়ে গেছে এমনটাও বলা যায় না। ‘কালিপদ মিষ্টান্ন ভান্ডার’ হয়ত সেই ধারারই উত্তরসূরি।

চুয়াডাঙ্গা জেলার সবচেয়ে বিখ্যাত এবং পুরাতন মিষ্টির দোকান ‘কালিপদ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’। এর প্রতিষ্ঠাতা স্বর্গীয় কালিপদ দাস (জন্মঃ১৮৯৩- মৃত্যুঃ১৯৭৫) ১৯১৮ সালে আলমডাঙ্গার বেলগাছি গ্রাম থেকে চুয়াডাঙ্গা শহরের রেলবাজারে গিয়ে মিষ্টির দোকান খোলেন। তাঁর কারিগরি নৈপুণ্য, পেশার প্রতি সততা, মিষ্টি তৈরিতে নির্ভেজাল কাঁচামালের ব্যবহার ইত্যাদির কারণে তাঁর প্রতিষ্ঠানের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। শোনা যায় তরুণ কালিপদ দাসের দোকানের রসগোল্লা, পান্তুয়া, চমচম কোলকাতার মিষ্টিপ্রিয় মানুষদেরও মনোহরণ করেছিল। এই প্রতিষ্ঠানটি এখনও সুনাম বজায় রেখেছে।

গত শতাব্দীর সত্তর- আশির দশকে মোড়ভাঙ্গার রসসোল্লা খুব নাম করেছিল। কয়েকটি পরিবার মিলে ঐ মিষ্টি তৈরি করত। পরে তাঁদের কেউ কেউ পেশা বদল করলে,কেউ কেউ দেশ ত্যাগ করে চলে গেলে সেই ধারার সমাপ্তি ঘটে। এখন আলমডাঙ্গা শহরের মিষ্টির কথা উঠলে হারাণচন্দ্র অধিকারীর ‘অধিকারী মিষ্টান্ন ভান্ডার, বাবু হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট, এবং কুটুমবাড়ী ফুড এন্ড সুইটস্ গার্ডেনের কথা মনে আসে। এসব প্রতিষ্ঠানের তৈরি রসগোল্লা, চমচম, ক্ষীরমোহন, দই, সন্দেশ, বুন্দে, ভুজিয়া, ঘি ইত্যাদির বেশ কদর লক্ষ করা যায়। এছাড়া আলমডাঙ্গার প্রায় প্রতিটি হাটে বাজারে যেসব মিষ্টির দোকান দেখতে পাওয়া যায় সেগুলোর মান চলনসই।

সুত্রঃ
১। বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা- চুয়াডাঙ্গা, বাংলা একাডেমি।
২। আলমডাঙ্গা উপজেলা পরিচিতি, রাজ কুমার রামেকা
৩। চুয়াডাঙ্গা জেলার ইতিহাস, রাজিব আহমেদ।