আমাদেরও একটা নদী ছিল।

154
আমাদেরও একটা নদী ছিল।
কুমার নদ

আমাগেরও একটা নদী ছিলু- হয়ত এই কথাটা বলবে আরো পঞ্চাশ বছর পর আমাদের উত্তর পুরুষরা। আমাদের পূর্ব পুরুষরা বলতেন, ‘বিষটি-বাদলার দিনি সোতের কড় কড় শব্দের জ্বালায় রাতি ঘুমাতি পাত্তাম না।‘ এখন আমরা যা দেখছি তা ঠিক নদী না, বরং ক্যানাল। নদীর চরিত্র হারালেও আমরা একে ‘কুমার নদ’ বলে ডাকি। ক্যানাল আকারে থাকলেও তো কিছু একটা আছে, কিন্তু যেভাবে ভরাট করে দখল উৎসব চলছে, তাতে পঞ্চাশ বছর পরে ‘কুমার নর্দমা’ হিসাবেও এটার অস্তিত্ব থাকবে বলে মনে হয় না।

নদী ভরাট করে নদীর জায়গা দখল করার স্বভাব আমাদের পুরানো। ভগিরথি, জলাঙ্গি এবং মাথাভাঙ্গা- এই তিনটি নদীকে বৃটিশরা Nadia Rivers বলে ডাকত। আমাদের কুমার বা পাঙ্গাসি নদ এই Nadia Rivers এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। সরকারী নথিতে তারা সেভাবেই রেকর্ড করেছিল। বৃটিশ বাংলার সার্ভেয়র জেনারেল মেজর জেমস রেনেল এদেশে প্রথম নদীপথের জরিপ কাজ শুরু করেন ১৭৬৪ সালে এবং শেষ হয় ১৭৭৩ সালে।

জরিপ কাজ শেষে ১৭৭৯ সালে রেনেল The Bengal Atlas নামে একটি মানচিত্রের সংকলন প্রকাশ করেন। তিনি তাঁর ঐ মানচিত্র সংকলনে কুমার নদের গতি পথ অংকন করেছিলেন। মেজর রেনেল সেই সমস্ত নদ-নদীগুলোকেই গুরুত্ব দিয়েছিলেন যেগুলোতে শুষ্ক মৌসুমেও নাব্যতা থাকত। অর্থাৎ আজ থেকে দুই শত পঞ্চাশ বছর আগে কুমার নদ ছিল সুস্বাস্থ্যে ঝলমলে একটা মহা জলপ্রবাহ।

১৯১০ সালের নদীয়া জেলা গেজেট থেকে জানা যায় ‘বান্ধাল’ (bandhal) এর কারণে মাথাভাঙ্গা এবং কুমার নদ নাব্যতা হারাচ্ছিল এবং শুষ্ক মৌসুমে মূল স্রোতের গভীরতা তিন ফুটের নিচে নেমে আসছিল। উল্লেখ্য, গেজেটের কয়েক জায়গায় কুমার নদের নাম ‘Kumar or Pangshi’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ১৮৫৯ সালে মাথাভাঙ্গা সহ অন্যান্য নদীগুলোর নাব্যতা রক্ষার জন্য ড্রেজিং করার দরকার হয়। কুমার নদের কিছু অংশকে তখন ড্রেজিংএর আওতায় আনা হয়।

এই দুই নদীর রেভিনিউ আয়ের বিরাট অংশ ড্রেজিং এর কাজে ব্যয় হয়ে যায়। ঐ বছর মাথাভাঙ্গা নদীর রেভিনিউ ছিল ২৪০২৮ (চব্বিশ হাজার আটাশ) টাকা। Nadia Rivers এর আওতায় থাকা নদীগুলোর নাব্যতা রক্ষায় ব্যয় হয়েছিল ২২,৩৬০/= (বাইশ হাজার তিনশত ষাট) টাকা। (Gazetteer of Nadia District- 1910, page-10)

তখন গাছ, বাঁশ, বালু ইত্যাদি ফেলে বান্ধাল দেওয়া হত। এখনও পাড় দখল করতে বাঁশ-কঞ্চি ব্যবহার করা হচ্ছে। পূর্ব পুরুষদের ঐতিহ্য বলে কথা!

১৯১০ সালের গেজেটিয়ার থেকে বোঝা যায় তখন পর্যন্ত এই কুমার বা পাঙ্গাসি নদটাই ছিল আলমডাঙ্গার যোগাযোগ এবং পণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যম। যদিও ১৮৬২ সালে এই অঞ্চলে ট্রেন যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিল, কিন্তু আলমডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশান বৃটিশ সরকারের কাছে কুমার নদের বন্দরগুলোর চেয়ে কিছুটা কম গুরুত্ব পেয়েছিল। সম্ভবত তখন আলমডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশানের রেভিনিউ আয় আলমডাঙ্গার আভ্যন্তরীণ নদীবন্দরগুলোর রেভিনিউ আয়ের তুলনায় কম ছিল।

Gazetteer of Nadia District এ বিষয়টা উঠে এসেছে এইভাবেঃ

“ The chief railway trade centres are Chuadanga, Bagula, Ranaghat, Damukdia and Poradah: there are also less important centres at Darsana, Sibnibas, Kumarkhali, Debagram and Kushtia. Those of river traffics are Nabawdip, Kaligonj and Matiari on the Bhagirathi…..; Hatbolalia, Chuadanga, Subalpur, Ramnagar, Mushigonj, Damurhuhda on the Mathabhanga…. Alamdanga on the Pangshi (Kumar).

(Gazetteer of Nadia District, 1910- page 96)

২০১৮ সালে এসে কি আমাদের কাছে এই কুমার নদের গুরুত্ব একেবারেই নেই হয়ে গেছে? আমার তা মনে হয় না। নদীর গুরুত্ব কোন কালেই কোন দেশে কমে যায়নি। বরং তা বেড়েছে এবং বাড়ছে। আমরা বাংলাদেশের সব মানুষ তা বুঝতে পারিনি, বুঝতে পারছি না, এবং ভবিষ্যতেও পারব বলে মনে হয় না। আমরা নদীগুলোর অপচয় করেছি এবং করছি, দখল করেছি এবং করছি, কিছু কিছু নদীকে ক্যনাল কিছু কিছু নদীকে নর্দমায় পরিণত করেছি এবং করছি আর কিছু কিছু নদীকে ‘নেই’ করে ফেলেছি এবং ফেলছি। কুমার নদও হয়ত একদিন নর্দমা হয়ে যাবে এবং তারপর ‘নেই’ হয়ে যাবে। তখন ‘আমাগেরও একটা নদী ছিলু’ বলে হাহুতাশ করব।

কুমার নদের গুরুত্ব মোটেও কমে যায়নি। সঠিক ভাবে প্রবাহিত করা গেলে এটা আবার আগের মতই আমাদের কাজে আসবে। নৌকা-ভেলা-ডুঙ্গা ইত্যাদি বাহন হিসাবে গুরুত্ব হারালেও আধুনিক নানা জলযান প্রতিনিয়ত বাজারে আসছে। একদিন সেগুলোর ব্যবহার হবে। চারতলার মোড় থেকে সাদা ব্রিজ পর্যন্ত জ্যামের সৃষ্টি হচ্ছে যা ভবিষ্যতে আরো প্রকট হবে। হয়ত হাউসপুর ব্রিজের থেকে জ্যাম শুরু হয়ে লাল ব্রিজ ছেড়ে আরো অনেক দূর পর্যন্ত ছাড়িয়ে যাবে। তাই এর সমান্তরালে কুমার নদটাকে বিকল্প হিসাবে ভবিষ্যতে ভাবা হবে। হয়ত ভবিষ্যতে আভ্যন্তরীণ নৌ রুটের কথাও ভাবা হবে, কারন নৌরুট সব সময় খুব cost effective।

শহরের জলাবদ্ধতা মাথা ব্যাথার কারন হয়ে দাড়াচ্ছে। এটার সমাধান কিন্তু কুমার নদের সঠিক ব্যবহারের মধ্যেই নিহিত। ভবিষ্যতের এরকম অসংখ্য বিষয় সামনে আসবে যার জন্য কুমার নদের বেঁচে থাকাটা খুবই জরুরী। তাই বর্তমানে আমাদের কাজ হচ্ছে নদটাকে বাঁচাতে দেওয়া। কুমার নদ না থাকলে এসব ভাবনা চিন্তা অবান্তর।

পুরান ঢাকায় থাকি। বুড়িগঙ্গা আমার বাসা থেকে পাঁচ মিনিট হাঁটার দুরত্বে। একে বাঁচানোর জন্য কত কিছুই না করা হচ্ছে (আসলে কিছু করা হচ্ছে?)। মাছ তো দূরের কথা, একটা জলজ প্রাণী নেই এই নদীতে। নদীর পাশে বসা যায় না। নদীর পানির গন্ধ নর্দমার মত। শুধু রাত্রে দূর থেকে লঞ্চ ইস্টিমার আর বন্দরের বাতি দেখতে ভাল লাগে। কিন্তু নদীটার জন্য খারাপ লাগে। রাজধানীর নদী। সেটার যদি এই অবস্থা হয় তাহলে কুমার নদকে কতৃপক্ষ কি চোখে দেখছে? যা করার আলমডাঙ্গার মানুষকেই করতে হবে।

ঢাকাই একটু বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা। মল মিশ্রিত পানিতে হাঁটতে হয়। জারে সরবরাহকৃত খাবার পানির মধ্যে মলের ব্যক্টেরিয়া। ভাবলেই শরীরের মধ্যে রি রি করে ওঠে। তখন দখল হয়ে যাওয়া নদী খাল বিলগুলোর কথা মনে হয়। দখলদাররাও মল মিশ্রিত পানিতে হাঁটছে, মলের ব্যক্টেরিয়া দূষিত পানি খাচ্ছে, এটা ভেবে সান্ত্বনা খুঁজি। জানি সেই সান্ত্বনা মিথ্যা সান্ত্বনা। প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়েছি, তাঁকে হত্যা করেছি, সে তো প্রতিশোধ নেবেই, তাইনা? আলমডাঙ্গায় আমরা মল মিশ্রিত পানিতে হাঁটতে চাই না, মলের ব্যক্টেরিয়া দূষিত পানিও পান করতে চাই না।